উপজেলা ঐতিহ্য

মেঘনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ ও কাঁকন নদী বিধৌত বাংলাদেশের বৃহত্তম উপজেলা রায়পুরা নরসিংদী জেলার দক্ষিণ-পূর্বাংশে অবস্থিত। এই উপজেলার উত্তরে বেলাব উপজেলা, পূর্বে কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা, দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুর এবং নরসিংদী সদর উপজেলা, পশ্চিমে নরসিংদী সদর ও শিবপুর উপজেলা অবস্থিত। এই উপজেলা প্রায় ২৩৫২// ও ২৪০৪// উত্তর অক্ষাংশেএবং ৯০ ৫৯// পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। রাজধানী ঢাকা ও নরসিংদী জেলা সদর থেকে রায়পুরা উপজেলা সদরের দূরত্ব যথাক্রমে ৭৯ কিঃ মিঃ ও ২২ কিঃ মিঃ। এর মোট আয়তন ৩১২.৫০ বঃ কিঃ মিঃ। তন্মধ্যে জলাশয় ও প্রশসত্ম নদী ৪৩.৭৭ বঃ কিঃ মিঃ।

রায়পুরা নামকরণের ইতিহাসঃ

 

কথিত আছে যে, বৃটিশ শাসন আমলে লর্ড কর্ণওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তা প্রথা চালু হওয়ার সময় এ অঞ্চল ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা জমিদারদের আওতায় আসে। উক্ত জমিদারদের কাছ থেকে সিকিমি পত্তন নেন এখানকার রায় উপাধিধারী কিছুসংখ্যক অমাত্য। এদের মধ্যে উলে­খ যোগ্য হলো প্রকাশ চন্দ্র রায়, পূর্ণ চন্দ্র রায়, মহিম চন্দ্র রায়, ঈশ্বর চন্দ্র রায় প্রমুখ। এদের নামানুসারে প্রথমে এলাকার নাম হয় ‘‘রায়নন্দলালপুর’’। পর্যায়ক্রমে নামের অপভ্রংশ রায়পুরা নামে প্রচলিত হয়। এখানে উলে­খ্য যে, পূর্বে এই এলাকা ‘‘কালীদহসাগরেরচর’’ নামে পরিচিত ছিল। পাকিস্তান আমলের প্রথম দিকেও এ অঞ্চল ময়মনসিংহ কালেকটরেটের আওতাভূক্ত ছিল। (তথ্যসূত্রঃ ১৮৯০ সালের গেজেটেরিয়ার)।

এ উপজেলাকে নিম্নবর্ণিত প্রধান তিন ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছেঃ

(ক) মধুপুর গড় ভূমি যা উপজেলার প্রায় ২ শতাংশ ভূমি,

(খ) ব্রহ্মপুত্র পলল ভূমি যা উপজেলার প্রায় ৫৫ শতাংশ ভূমি এবং

(গ) মেঘনা পলল ভূমি যা উপজেলার প্রায় ৪৩ শতাংশ ভূমি।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের  অপার লীলাভূমি নরসিংদী জেলাধীন রায়পুরা একটি ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ উপজেলা। বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নদী মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ এ উপজেলার চতুর্দিকে ত্রিভূজাকারে বেষ্টন করে আছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম কেন্দ্র অত্র উপজেলাটি প্রকৃতিগতভাবেই দুই ভাগে বিভক্ত। উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের ৮টি ইউনিয়ন চরাঞ্চল অর্থাৎ নিম্নভূমি। বাকী উত্তরাঞ্চল পাহাড়ী অঞ্চল (লালমাটি) এবং সমতল ভূমি। দক্ষিণাঞ্চলের চর এলাকায় প্রচুর মিষ্টি আলু, খিরা, বাঙ্গি, তরমুজ ও চিনাবাদাম উৎপন্ন হয় এবং উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ী এলকায় প্রচুর কাঁঠাল, পেয়ারা, লটকন ও শাক-সব্জী উৎপন্ন হয়। ২৪টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে গঠিত রায়পুরা উপজেলার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তৎকালীন হিন্দু জমিদারদের বিশাল প্রভাব ও ঐতিহ্য। জমিদারী প্রথা বিলুপ্তির পর তারা অনেকেই চলে গেছেন শহরে কিংবা অন্যত্র। তবে অনেকেরই পুরনো বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ এখনও স্মৃতি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। অনুমান করা হয়, নীল চাষের লক্ষ্যে ইংরেজরা ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই উপজেলার গোড়াপত্তন করেছিলেন। তাদের প্রতিষ্ঠিত নীলকুঠি আজও তার স্বাক্ষ্যবহন করছে। ইংরেজ আমল থেকে বিশাল জনগোষ্ঠীর থানা হিসেবে পরিচিত থাকলেও পরবর্তীকালে এ থানার অংশবিশেষ ভেঙ্গে শিবপুর, মনোহরদী ও বেলাব নামে তিনটি থানার গোড়াপত্তন হয়েছে। বৃটিশ আমল থেকেই শিক্ষাদীক্ষায় এ উপজেলা ছিল ঐতিহ্যবাহী। এদশের কৃতি সন্তান কবি শামসুর রাহমান, কবি ও কথা সাহিত্যিক ডঃ আলাউদ্দিন আল-আজাদ, প্রাবদ্ধিক বাবু অক্ষয়কুমার রায়, শিক্ষাবিদ জিয়াউদ্দিন আহমেদ, শফিক উদ্দিন আহমেদ এদেশের শিক্ষাও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে উজ্জ্বল করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর জনাব খোরশেদ আলম, ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ জনাব ওসমান গণি সাহেবের জন্মস্থানও এ উপজেলায়। উলে­খ্য যে, প্রথিতযশা সঙ্গীতজ্ঞ শিল্পী ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ শৈশবে তার মাতুলালয় রায়পুরাতে লালিত-পালিত হন।

খেলাধূলার ব্যাপারেও এ উপজেলার অতীত ঐতিহ্য রয়েছে। বৃটিশ শাসনামলে রায়পুরার ফুটবল টিম সূদুর কোলকাতা ও আসামের বিভিন্ন স্থানে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে।

রায়পুরার জীবন-জীবিকা মুলতঃ কৃষি নির্ভর হলেও এক সময় তাঁত শিল্প এ এলাকায় ব্যাপক প্রসার লাভ করেছিল। বর্তমানে হাসনাবাদ, আমিরগঞ্জ, রাধাগঞ্জ এবং পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কিছু পাওয়ার লুম তাঁত শিল্পের অতীত ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। এলাকার তাঁতীরা তাঁতের কাপড় যথা লুঙ্গী, গামছা, শাড়ী এবং গ্রে কাপড় উপজেলাবাসীর চাহিদা মিটিয়ে প্রাচ্যের ‘‘ম্যাঞ্চেস্টার’’ বলে খ্যাত বাবুরহাটে (শেকেরচর) – নিয়মিত সরবরাহ করে আসছে।

বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনেও এ উপজেলার লোকজন পিছিয়ে নেই। মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলনে রায়পুরার জনগণ যে উদ্যোগ নিয়েছিল ও উন্মাদনা দেখিয়েছিল সারা বাংলায় তার দ্বিতীয় নজির ছিল না। রায়পুরার মাটিতেই সেই আন্দোলন সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন এখান থেকেই শুরু হয়েছিল পাকিস্তান আন্দোলনের সূচনা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ ও মহাজনী শোষণের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তাতেও রায়পুরার ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এ উপজেলার প্রায় তিন হাজার মুক্তিপাগল স্বাধীনচেতা লোক সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এদেশের স্বাধীনতা বাস্তবায়নের পথে এক অবিস্মরণীয় অবদান রেখে জাতির ইতিহাসে এক নব দিগন্তের উন্মেষ ঘটিয়েছিল। রায়পুরা উপজেলা হতে এত বিপুলসংখ্যক লোক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল যা বাংলাদেশের অনেক জেলা হতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের চেয়েও বেশী।

উলে­খ্য, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেনেন্ট মতিউর রহমান রায়পুরারই কৃতি সন্তান। মুক্তিযুদ্ধে এ মহান বীর সৈনিকের অবদান রায়পুরার জনগণ তথা দেশবাসী গভীর শ্রদ্ধাভরে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছে।

রায়পুরা উপজেলা ঢাকা মহানগরীর নিকটবর্তী একটি বিশাল উপজেলা। রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও এই উপজেলার অভ্যন্তরীন যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব একটা ভাল ছিল না। বিশেষ করে চরাঞ্চলের ৮টি ইউনিয়নের সাথে উপজেলা সদরের যোগাযোগ এক প্রকার বিচ্ছিন্নই ছিল বলা যায়। নৌকা এবং পায়ে হাঁটা ছাড়া যোগাযোগের বিকল্প কোন ব্যবস্থা এখানে ছিল না। ফলে, ঐ সকল এলাকায় কখনো কখনো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছিল । বর্তমানে  চড়াঞ্চলের ৬ টি ইউনিয়ের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। এই ৬টি ইউনিয়নে খুব প্রশস্ত রাস্তা ও ব্রীজ নির্মান হয়েছে এবং একটি ফেরি আছে। বর্তমানে ফেরিঘাটের নাম পান্থশালা। এই পান্থশালা জায়গাটি ধীরে ধীরে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখানে অনেক পর্যটক ঘুরতে আসে। প্রায় ৫ লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যূষিত এই উপজেলায় পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। উলে­খ্য, এই উপজেলায় কোন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় নেই। অভ্যমত্মরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে এই উপজেলার বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে দক্ষজনশক্তিতে পরিণত করা গেলে এবং আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা গেলে এটিকে আদর্শ উপজেলায় উন্নীত করা সম্ভব হতো।