মুক্তিযুদ্ধে রায়পুরা

রায়পুরার দামাল সত্মানেরা  এতো বেশি সংখ্যায় ভারতের ট্রেনিং শিবিরে যায় যে ভারতীয়রা রায়পুরাকে একটি জেলা হিসেবে প্রায়শই ভুল করতে থাকে । যাহোক রায়পুরা থানার মুক্তিযুদ্ধ যারা পরিচালনা করেন তাঁরা হলেন এ্যাডভোকেট আফতাব উদ্দিন ভুঞা , রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু ও আলহাজ্ব গয়েছ আলী মাস্টার । গয়েছ আলী মাস্টার রায়পুরা থানা মুক্তিযোদ্ধাদের কামান্ডার ছিলেন । রায়পুরার আরেক কৃতি সত্মান কর্নেল নূরম্নজ্জামান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার । বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেঃ মতিউর রহমানও রায়পুরার সূর্যসত্মান । এছাড়া রায়পুরার আরো অনেকে মুক্তিযুদ্ধে দুঃসাহসী অবদান রাখেন । রায়পুরা থানার বিভিন্ন স্থানে হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যক্ষ যুদ্ধ হয়েছে । রায়পুরা থানার যে সমস্ত স্থানে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এর বেশির ভাগই রায়পুরার পশ্চিম  অঞ্চলে , হাটুু ভাঙ্গা, আমিরগঞ্জ , বাদুয়ারচর রেলসেতুর পাশে । মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে বাদুয়ার চর রেলসেতু মুক্তিযোদ্ধারা  মাইনের সাহায্যে উড়িয়ে দেয়। এতে পাক বাহিনী মারাত্মক বাধার সস্মুখীন হয় । এর কিছুদিন পর রামনগর রেলসেতুও মুক্তিবাহিনী মাইনের সাহায্যে উড়িয়ে দেয় । হাঁটুভাঙ্গা বর্তমানে রেলস্টেশনের নিকট পাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তবাহিনীর জোয়ানদের সামানাসামনি যুদ্ধ বাঁধে ।এতে পাক বাহিনী টিকতে না পেরে হেরে যায় । এই যুদ্ধে বহু পাক সেনা নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে টিকতে না পেরে পাকসেনারা যখন পালিয়ে যাচ্ছিলো তখন হাঁটুভাঙ্গার জনগণ এমনকি মহিলারাও সেদিন যার যা কিছু আছে তা দিয়ে পিটিয়ে বাকুপিয়ে শক্রসেনাদের হত্যা করেছে । আমাদের মুক্তিসেনাদেরও কিছু সাহসী  তরম্নণসহ নিরীহ মা, বোন , দেশের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে শহীদ হয়েছেন । স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে বেশীর ভাগ মুক্তিযোদ্ধাই শহীদ হয়েছেন পাকসেনাদের সহযোগী দালাল ও রাজাকাদের হাতে।তৎকালীন রায়পুরা থানা মুক্তিযুদ্ধের র্সবাধিনায়ক আলহাজ্ব গয়েছ আলী মাস্টারের সাথে এ ব্যাপারে  আলাপ করলে তিনি বলেছিলেন , “আমার মাস্টারি জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ইতিহাস হলো এইমুক্তিসংগ্রাম । মুক্তিযুদ্ধের কথা মনে হলেই  আমার মন দুঃক ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে । আজ আমি নিজেকে বড় অপরাধী মনে করি । কারণ , আমি আমার প্রিয় ছাত্রদেরকে তাদের বাবা মায়ের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে গিয়েছিলাম , দেশ স্বাধীন হলে তাদের বাবা মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেবে  বলে কিন্তু দুঃখের বিষয় , দেশ স্বাধীন হবার পর যখন কিছু বাবা ও মা আমার কাছে এসে বললেন , ‘মাস্টারসাব আপনে আইছেন আমার ছেলে কই ? কবে আইব ।’ তখন আমি তাদের কোন জবাব দিতে পারিনি । আমার মনে হচ্ছিলো , আমি সবচেয়ে অপরাধী , আমি সবার চেয়ে বেঈমান ।সারা জীবন অনুশোচনা করলেও আমার প্রায়শ্চিত্ত হবে না । আজ যখন দেখি স্বাধীনতার  ২৮ বছর পর যারা জীবন দিয়ে গেল ; তাদের মা, বাবা, ভাই , বোন , ছেলে , মেয়ে ভাত ও কাপড়ের অভাবে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে , তখন আমি  ঠিক থাকতে পারিনা ।ইচ্ছা করে আর একটা মুক্তিযুদ্ধ করি । এরজন্যই কি সেদিন মুক্তিসংগ্রাম করেছিলাম? সেদিন ভেবেছিলাম ; দেশ স্বাধীন হলে , মানুষ পাকিস্তানিদের হাত থেকে মুক্তিপাবে , মানুষ তাদের রাজনৈতিক মুক্তি পাবে । গণতান্ত্রিক মুক্তি পাবে , কিন্তু কই ! আজ ও মানুষ না খেয়ে মরছে । মা, বোন , ভাতের অভাবে পথে ঘাটে ইজ্জত বিক্রি করছে; যে শিশুর লেখাপড়া করার কথা , সে শিশু ভাতের অভাবে জলের দামে শ্রম দিচ্ছে । মানুষ তার গণতাত্রান্তিক অধিকার হারচচ্ছে। একদিকে নগণ্য মানুষ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ  হচ্ছে অন্যদিকে গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষ দিন দিন ভূমিহীন হচ্ছে।আজ দেশবাসীর কাছে আমার প্রশ্ন , এই অবস্থার কি পরিবর্তন আসবে না?”